১৩ বছর বয়সী মায়ের জিম্মায় থাকবে ৭ মাসের শিশু

ঢাকার হাজারীবাগের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী ও তার সাত মাস বয়সী শিশুকে ঘিরে আলোচিত ঘটনায় আপাতত শিশুটিকে মায়ের জিম্মায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়। তবে শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন পারিবারিক আদালত।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত শুনানি শেষে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খান এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সাত মাস বয়সী দুগ্ধপোষ্য শিশুটি আপাতত তার মায়ের কাছেই থাকবে। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, প্রচলিত আইন এবং শিশুটি দুগ্ধপোষ্য হওয়ায় এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে স্থায়ী অভিভাবকত্ব নির্ধারণের বিষয়টি পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত।
শুনানিতে কিশোরী ভবিষ্যতে টিকটকসহ কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ না করার অঙ্গীকার করেছেন। একই সঙ্গে তার পরিবার অভিযোগ করেছে, কিশোরীকে ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া, কথিত বিয়ে, যৌন নির্যাতন ও প্রতারণার ঘটনায় তারা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, কিশোরীর বয়স ২০ বছর ছিল এবং তারা পারিবারিক আদালতে ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশাবাদী।
এ ঘটনায় শিশুর হেফাজত, কথিত বিয়ের বৈধতা, কিশোরীর প্রকৃত বয়স এবং উত্থাপিত ফৌজদারি অভিযোগ—সবগুলো বিষয় এখন পৃথক আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।প্রয়োজনে এটিকে আরও সংবাদপত্র-উপযোগী বা অনলাইন পোর্টালের ব্রেকিং নিউজ স্টাইলে সংক্ষিপ্ত করে দিতে পারি।
সকাল থেকেই ছিল দুই পক্ষের উপস্থিতি
মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে ছিল ব্যাপক কৌতূহল। আলোচিত এ ঘটনার শুনানিকে কেন্দ্র করে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদেরও ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়।
এদিন সকালে কিশোরীটি তার মা-বাবা ও সাত মাসের শিশুকে নিয়ে লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে হাজির হন। অন্যদিকে, উপস্থিত ছিলেন অভিযুক্ত হিসেবে আলোচিত শাকিল মিয়া ও তার পক্ষের প্রতিনিধিরাও।
আদালত সূত্রে জানা যায়, শুনানি চলাকালে দুই পক্ষকে আলাদাভাবে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। শুনানি শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকে জানানো হলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় উভয় পক্ষকে কিছু সময়ের জন্য লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের একটি কক্ষে রাখা হয়।
কী সিদ্ধান্ত দিলো লিগ্যাল এইড শুনানি শেষে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খান গণমাধ্যমকে বলেন, আলোচিত এ ঘটনায় শিশুর বয়স মাত্র সাত মাস। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, এমন দুগ্ধপোষ্য শিশু মায়ের সঙ্গেই থাকার অধিকারী। তাই আপাতত শিশুটি তার মা অনামিকা আক্তার জুঁইয়ের হেফাজতেই থাকবে।
তিনি বলেন, শুনানিতে কিশোরী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি আর টিকটক কিংবা ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশ করবেন না। শিশুকে নিজের কাছে রেখে তার লালন-পালনে মনোযোগ দেবেন।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, অভিযুক্ত শাকিল মিয়া শিশুর অভিভাবকত্ব চেয়ে পারিবারিক আদালতে গার্ডিয়ানশিপ মামলা করেছেন। সে মামলায় আদালত যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন, ভবিষ্যতে শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
‘লিগ্যাল এইড ও আদালত এক নয়’ এদিকে গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিতে গিয়ে মো. সায়েম খান একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, অনেক সংবাদে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন আদালতের আদেশে শিশুটি উদ্ধার হয়েছে। বাস্তবে এটি আদালতের আদেশ নয়; এটি ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের আইনগত ক্ষমতার প্রয়োগ।
২০২৫ সালে সংশোধিত আইনের মাধ্যমে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে থাকা কোনো শিশুকে উদ্ধারের ক্ষমতা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারকে দেওয়া হয়েছে। সেই ক্ষমতাবলেই চকবাজার থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং পরে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে।
তিনি বলেন, লিগ্যাল এইডের কাজ শুধু আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা করা নয়; বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, আইনি পরামর্শ এবং অসহায় মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তাও প্রদান করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে সতর্কবার্তা শুনানিতে কিশোরী ও তার পরিবারের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে সতর্কবার্তা দেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার।
তিনি বলেন, কিশোরী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি আর টিকটক বা ফেসবুকে ভিডিও করবেন না। একই সঙ্গে তিনি কিশোরীর মা-বাবাকে সন্তানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোথায় যাচ্ছে— এসব বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
তার ভাষায়, বর্তমানে অনেক অভিভাবক অল্প বয়সে সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন, কিন্তু তারা কী করছে তা পর্যবেক্ষণ করছেন না। এমন অবহেলার কারণেও অনেক সময় ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়েও মন্তব্য বক্তব্যে তিনি সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়েও কথা বলেন। তার ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও সম্পর্কে ভিত্তিহীন বা নেতিবাচক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া আইনগতভাবে অপরাধ হতে পারে। তাই ব্যক্তি ও গণমাধ্যম— উভয়কেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, সমাজে বাল্যবিয়ে, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আরও ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনার কথাও জানান।
যা বললেন কিশোরীর আইনজীবী শুনানি শেষে কিশোরীর আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র জাগো নিউজকে বলেন, লিগ্যাল এইড অফিসার দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আদালতের সর্বশেষ অবস্থান অনুযায়ী দুগ্ধপোষ্য শিশুটি মায়ের কাছেই থাকবে।
তিনি বলেন, ভিক্টিমের মা সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। এখন পরিবার মিলে শিশুটিকে লালন-পালন করবে।শুনানিতে কিশোরীকে শর্ত দেওয়া হয়েছে— তিনি টিকটক করবেন না এবং অনলাইনে অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন না। শিশুর দেখভালেই মনোযোগ দিতে হবে।
আইনজীবীর দাবি, অভিযুক্ত পক্ষ পারিবারিক আদালতে গার্ডিয়ানশিপ মামলা করার পরই লিগ্যাল এইডে আবেদন করা হয়। পরে লিগ্যাল এইড অফিসারের নির্দেশে চকবাজার থানা পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে।
‘২০ বছর নয়, বয়স ১৩ বছর’
জন্মনিবন্ধনের তথ্য নিয়ে নতুন করে বক্তব্য দেন কিশোরীর আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র। তিনি দাবি করেন, অনলাইনে থাকা জন্মনিবন্ধনে কিশোরীর জন্মসাল ২০১৩। কিন্তু অভিযুক্ত পক্ষ সেটি পরিবর্তন করে বয়স ২০ বছর দেখানোর চেষ্টা করছে।
তার ভাষ্য, বর্তমানে কিশোরীর প্রকৃত বয়স ১৩ বছর ৫ মাস ১৩ দিন। তাই এটিকে তারা বাল্যবিয়েও বলতে রাজি নন। কারণ, স্ট্যাম্প বা নোটারির মাধ্যমে তৈরি কাগজ কোনো বৈধ বিয়ে নয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রস্তুতি, চলবে পৃথক আইনি লড়াই শুনানি শেষে কিশোরীর আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র জাগো নিউজকে বলেন, শিশুর অস্থায়ী হেফাজতের বিষয়টি নিষ্পত্তি হলেও পুরো ঘটনার ফৌজদারি দিক নিয়ে এখন নতুন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। খুব শিগগির, সম্ভবত আগামীকাল বা পরশুর মধ্যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হবে। তাদের দাবি, নাবালিকা কিশোরীকে ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া, কথিত বিয়ের নামে প্রতারণা, যৌন নির্যাতন এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার ঘটনায় প্রযোজ্য আইনে বিচার চাওয়া হবে।
তিনি বলেন, শিশুর অভিভাবকত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা একটি দেওয়ানি (সিভিল) বিষয়, যা পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। এ কারণে অভিযুক্ত পক্ষ শিশুর গার্ডিয়ান শিপ চেয়ে যে মামলা করেছে, সেটির বিচার পারিবারিক আদালতেই চলবে। অন্যদিকে, নাবালিকার সঙ্গে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারযোগ্য হওয়ায় সেসব অভিযোগে পৃথক মামলা করা হবে।
মৃণাল কান্তি মিত্রের দাবি, আসামিপক্ষ শুরু থেকেই কিশোরীর প্রকৃত বয়স গোপন করার চেষ্টা করেছে। অনলাইনে থাকা জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তন করে তার বয়স ২০ বছর দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে তারা আইনি দায় এড়াতে পারে। একইভাবে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে এবং নোটারির মাধ্যমে তৈরি করা কাগজকে বৈধ বিয়ের দলিল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হলেও, আইন অনুযায়ী এর কোনো বৈধতা নেই। তার ভাষ্য, এটি কোনো বৈধ বিয়ে নয়; বরং আইনের অপব্যবহার করে নিজেদের দায়মুক্ত করার চেষ্টা।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সাত মাস বয়সী শিশুটি আদালতের নির্দেশে তার মায়ের জিম্মায় রয়েছে এবং ভিক্টিমের মা সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসে পরিবারসহ শিশুটির লালন-পালনের দায়িত্ব নিয়েছেন। এখন পরবর্তী আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী কিশোরীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য শুনানি শেষে অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবী গণমাধ্যমকে বলেন, তাদের কাছে কিশোরীর বয়স ২০ বছর হওয়ার পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। পারিবারিক আদালতে চলমান মামলায় তারা ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা করছেন।
তবে নিজের নাম-পরিচয় জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি অন্য শুনানির কথা বলে দ্রুত কার্যালয় ত্যাগ করেন।
যে ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনায় আসে রাজধানীর হাজারীবাগের ওই কিশোরীকে নিয়ে কয়েকদিন ধরেই দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় টিকটকের মাধ্যমে শাকিল মিয়া নামে এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাকে ফুসলিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে নোটারির মাধ্যমে কথিত বিয়ের কাগজ তৈরি করা হয়।
পরিবারের দাবি, কোনো বৈধ কাবিন হয়নি। পরবর্তীতে কিশোরী সন্তান জন্ম দেন। কয়েক মাস পর শিশুটিকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়। এরপর চলতি বছরের ২০ মে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে আবেদন করেন কিশোরী।
লিগ্যাল এইডের নির্দেশে গত ২৮ জুলাই চকবাজার থানা পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়। সেই ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এখন কী হবে লিগ্যাল এইডের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাত মাস বয়সী শিশুটি আপাতত তার মায়ের কাছেই থাকবে। তবে এটি স্থায়ী অভিভাবকত্বের সিদ্ধান্ত নয়।
শিশুর অভিভাবকত্ব নিয়ে পারিবারিক আদালতে চলমান মামলার রায়ের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে চূড়ান্ত হেফাজত নির্ধারণ হবে।
অন্যদিকে কিশোরীর পরিবার অপহরণ, ধর্ষণ, বাল্যবিয়ে ও প্রতারণার অভিযোগে পৃথক ফৌজদারি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে শিশুর হেফাজত, কথিত বিয়ের বৈধতা, কিশোরীর প্রকৃত বয়স এবং ফৌজদারি অভিযোগ— সবগুলো বিষয় এখন ভিন্ন ভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
বিয়ের বয়স নিয়ে কী বলছে আইন দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নারীদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। নির্ধারিত বয়সের আগে সম্পন্ন হওয়া বিয়ে বাল্যবিয়ে হিসেবে গণ্য হয় এবং তা আইনসম্মত নয়। আইন অনুযায়ী, উভয় পক্ষের স্বাধীন ও স্বেচ্ছায় সম্মতি ছাড়া কোনো বিয়ে বৈধ হতে পারে না। জোরপূর্বক আদায় করা সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন বিয়েও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
ঢাকা মহানগর আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব জাগো নিউজকে বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নারীদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। এর কম বয়সে সম্পন্ন হওয়া বিয়ে বাল্যবিয়ে হিসেবে গণ্য হয় এবং এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু বয়সের শর্ত পূরণ হলেই বিয়ে বৈধ হয় না; উভয় পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাধীন সম্মতিও আইনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। জোরপূর্বক, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বা প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন কোনো বিয়ে আইনি সুরক্ষা পায় না। যদি কোনো নাবালিকাকে প্রলোভন দেখিয়ে, অপহরণ করে বা জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, দণ্ডবিধি বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনায় ভুক্তভোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
নোটারির মাধ্যমে বিয়ে কি বৈধ? আইনজীবীদের মতে, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা কোনো অ্যাফিডেভিট মুসলিম বিয়ের বৈধ বিকল্প নয়। মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে কাবিন সম্পন্ন হলেই কেবল সেই বিয়ে আইনগত স্বীকৃতি পায়।
কোর্টের আইনজীবীদের ভাষ্য, নোটারির মাধ্যমে করা তথাকথিত বিয়ের ভিত্তিতে স্বামী-স্ত্রীর কোনো আইনি অধিকার– যেমন দেনমোহর, খোরপোশ বা উত্তরাধিকার দাবি করা যায় না। বয়স গোপন করে এ ধরনের অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে বাল্যবিয়ের চেষ্টা করলে সেটিও দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব জাগো নিউজকে বলেন, দেশের প্রচলিত আইনে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা কোনো অ্যাফিডেভিট বা ঘোষণাপত্র মুসলিম বিবাহের আইনগত বিকল্প নয়। মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজির মাধ্যমে কাবিন নিবন্ধন সম্পন্ন হলেই কেবল সেই বিয়ে আইনগত স্বীকৃতি পায়।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বয়স গোপন করে বা ভুল তথ্য দিয়ে নোটারির মাধ্যমে তথাকথিত বিয়ের দলিল তৈরি করা হয়। কিন্তু এ ধরনের দলিল কোনোভাবেই বৈধ বিয়ের প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না এবং এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার বা বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধে এমন অ্যাফিডেভিটের ভিত্তিতে দাবি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যদি কোনো নাবালিকার বয়স গোপন করে নোটারির মাধ্যমে বিয়ের চেষ্টা করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনসহ অন্যান্য প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই বিয়ে অবশ্যই আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়, নিবন্ধিত কাজির মাধ্যমে এবং প্রকৃত বয়স ও পরিচয় যাচাই করে সম্পন্ন করা উচিত।
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে আইনের অবস্থান ২০২৬ সালে সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।
আইনজীবীদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে এবং আপসের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত।
বিষয়টি সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব জাগো নিউজকে বলেন, ২০২৬ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আনা সংশোধনের ফলে ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর ক্ষেত্রে আইনের সুরক্ষা আরও জোরদার হয়েছে।
তিনি বলেন, সংশোধিত আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে এ ধরনের মামলায় ভুক্তভোগীর সম্মতির প্রশ্নটি আইনি দায় নির্ধারণে প্রাধান্য পায় না; মূল বিষয় হলো ভুক্তভোগীর বয়স এবং ঘটনার প্রমাণ।








